একাকী থাকলে নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলেন অনেকেই। কেউ কোনো কাজের পরিকল্পনা করতে গিয়ে উচ্চস্বরে ভাবেন, কেউ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে নানা প্রশ্ন করেন, আবার কেউ কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকেই সাহস দেন।
বিষয়টি বাইরে থেকে অস্বাভাবিক মনে হলেও, মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নিজের সঙ্গে কথা বলা বা ‘সেলফ-টক’ মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানী গ্রেস টোওয়ারেকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সেলফ-টক নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে যাচাই এবং সংগঠিত করার একটি উপায়।
মানুষ যখন নিজের সঙ্গে কথা বলে, তখন কোনো পরিস্থিতি নিয়ে ভাবনা গুছিয়ে নেওয়া, সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা কোনো কাজের পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে। শুধু তাই নয়, ইতিবাচক সেলফ-টক মানসিকভাবেও উপকারী হতে পারে। যেমন, কোনো কঠিন কাজের আগে নিজেকে বলা—‘আমি ধীরে ধীরে করতে পারব’ বা ‘একবারে একটি কাজ করি’—মনোযোগ ধরে রাখতে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
তবে সব ধরনের সেলফ-টক একই রকম নয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, নিজের সঙ্গে ক্রমাগত নেতিবাচক কথোপকথন মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন—‘আমি কিছুই পারি না’ বা ‘সবসময় আমার ভুল হয়’—এ ধরনের চিন্তা নেতিবাচক চিন্তার ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কেউ নিজের সঙ্গে কথা বলছেন কি না, শুধু সেটি দিয়ে মানসিক সমস্যার বিষয়টি বোঝা যায় না। বরং কথোপকথনের ধরন, কত ঘন ঘন হচ্ছে এবং তা দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্বেগের ক্ষেত্রেও এর তীব্রতা, কত ঘন ঘন হচ্ছে, কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে এবং কাজ, ঘুম, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনে কতটা বাধা তৈরি করছে—এসব বিবেচনা করা হয়।
তাই মাঝে মাঝে নিজের সঙ্গে কথা বলা বা মনে মনে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করাকে নিজেই মানসিক সমস্যার লক্ষণ হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং অনেকের জন্য এটি চিন্তা গোছানো, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা কিংবা চাপের মুহূর্তে নিজেকে সামলানোর একটি স্বাভাবিক কৌশল হতে পারে।
তবে নিজের সঙ্গে কথোপকথনের কারণে যদি উদ্বেগ ও নেতিবাচক চিন্তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয় কিংবা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
আর কেউ যদি নিজের চিন্তার পরিবর্তে এমন কণ্ঠস্বর শুনতে পান, যেটিকে তিনি নিজের চিন্তা হিসেবে অনুভব করছেন না, তাহলে বিষয়টি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। এমন অভিজ্ঞতা হলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অর্থাৎ, নিজের সঙ্গে কথা বলা স্বাভাবিক কি না—এর উত্তর শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া যায় না। কী বলা হচ্ছে, কেন বলা হচ্ছে, কত ঘন ঘন হচ্ছে এবং তা ব্যক্তির জীবনে কী প্রভাব ফেলছে—এসব বিষয়ই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
জি বাংলা ডেস্ক